সহিংসতাকে বৈধতা দেয় সকল ধর্ম আর ধর্মগ্রন্থগুলো 

bang.jpeg

ইতিহাসের পাতা খুললে আমরা ধর্মযুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং গণহত্যার অগণিত উদাহরণ খুঁজে পাই, যা মানবতাকে লজ্জিত করে।ধর্মের নামে রক্তপাত ঘটানোর এই প্রবণতার পেছনে কিছু গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে।

অনেক ধর্ম, বিশেষ করে একেশ্বরবাদী ধর্মগুলো, এক ধরনের চরম সত্যের দাবি করে। যখন ‘আমার ঈশ্বরই একমাত্র সত্য ঈশ্বর, আমার পথই মুক্তির একমাত্র পথ’ এই বিশ্বাসটি প্রবল হয়, তখন অন্যান্য বিশ্বাসকে শুধু ভিন্নমত হিসেবেই দেখা হয় না, বরংসেগুলোকে মিথ্যা, শয়তানি প্ররোচনা বা পবিত্র সত্যের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখা হয়। এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান থেকে, ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা আর কোনো সাধারণ অপরাধ থাকে না, এটি এক ধরনের ‘পবিত্র কর্তব্যে’ পরিণত হয়।সমাজবিজ্ঞানী মার্ক ইয়ুর্গেনসমেয়ার তাঁর যুগান্তকারী বই ‘টেরর ইন দ্য মাইন্ড অফ গড’-এ দেখিয়েছেন যে, ধর্মীয় সন্ত্রাসীরা তাদেরসংগ্রামকে কোনো সাধারণ জাগতিক বা রাজনৈতিক যুদ্ধ হিসেবে দেখে না। তারা একে একটি ‘মহাজাগতিক যুদ্ধ’ হিসেবে দেখে, যাভালো ও মন্দ, ঈশ্বর ও শয়তান, সত্য ও মিথ্যার মধ্যে এক অন্তহীন সংগ্রাম (ইয়ুর্গেনসমেয়ার, ২০০৩)। এই মহাজাগতিক প্রেক্ষাপটেপার্থিব আইন, নৈতিকতা বা মানবতার কোনো স্থান নেই। এমনকি নিরপরাধ মানুষ হত্যা করাও ঈশ্বরের ইচ্ছা পূরণের একটি উপায়হয়ে ওঠে।

মধ্যযুগের ক্রুসেডগুলো ছিল এর এক ভয়াবহ উদাহরণ, যেখানে খ্রিস্টান ও মুসলমানরা পবিত্র ভূমি (জেরুজালেম)-এর নিয়ন্ত্রণ নিয়েশতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেছিল। ইউরোপে প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কারের পর, ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে ত্রিশবছরের যুদ্ধ প্রায় পুরো মহাদেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছিল। স্প্যানিশ ইনকুইজিশন ‘ধর্মদ্রোহীদের’ খুঁজে বের করে তাদের ওপরঅবর্ণনীয় নির্যাতন চালাত। ধর্মের ভিত্তিতে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভাজনের সময় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানিঘটে। এই ধারা আধুনিক যুগেও অব্যাহত রয়েছে। উত্তর আয়ারল্যান্ডের ক্যাথলিক-প্রোটেস্ট্যান্ট সংঘাত, মিয়ানমারে বৌদ্ধজাতীয়তাবাদীদের দ্বারা রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নির্যাতন, কিংবা আল-কায়েদা ও আইসিসের মতো জিহাদি গোষ্ঠীগুলোরবিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ধর্ম একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে।

ধর্ম প্রায়শই শুধু সহিংসতাকে বৈধতাই দেয় না, বরং একে মহিমান্বিতও করে। ‘ধর্মের জন্য মৃত্যুবরণ’ বা শাহাদাতের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমেপরকালে অনন্ত সুখ ও পুরস্কারের হাতছানি দেওয়া হয়। এই বিশ্বাস মৃত্যুকে একটি ভয়াবহ পরিণতি থেকে একটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যেরূপান্তরিত করতে পারে, যা সাধারণ মানুষকে আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী বা অত্যন্ত নৃশংস যোদ্ধায় পরিণত করতে সক্ষম।

সহিংসতার মূলে রয়েছে অসহিষ্ণুতা। ধর্ম প্রায়শই ‘আমরা’ (অন্তর্গোষ্ঠী) এবং ‘তারা’ (বহির্গোষ্ঠী)-র মধ্যে একটি অত্যন্ত শক্তিশালীমনস্তাত্ত্বিক বিভেদ তৈরি করে। সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব অনুসারে, মানুষ মূলত তাদের গোষ্ঠীগত পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে আত্মসম্মানগড়ে তোলে। ফলস্বরূপ, নিজের গোষ্ঠীকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার জন্য অন্যান্য গোষ্ঠীকে নিকৃষ্ট, অপবিত্র বা বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিতকরার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা দেখা যায়। ধর্ম এই ‘আমরা-ওরা’ বিভাজনের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করে।

যখন কেউ ধর্মদ্রোহিতা ও ঈশ্বরনিন্দা করে, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলো তাদের আদর্শগত বিশুদ্ধতা বা গোঁড়ামি বজায় রাখার জন্য সেই মানুষের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মূল মতবাদ থেকে যেকোনো বিচ্যুতিকে ‘ধর্মদ্রোহিতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং এরশাস্তি হিসেবে ধর্মচ্যুত করা থেকে শুরু করে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। একইভাবে, ঈশ্বর বা ধর্মের কোনো পবিত্র প্রতীককে অপমানকরাকে ‘ঈশ্বরনিন্দা’ হিসেবে গণ্য করা হয়। ইতিহাসে এর অগণিত উদাহরণ রয়েছে। জিয়োর্দানো ব্রুনোকে আগুনে পুড়িয়ে মারাহয়েছিল কারণ মহাবিশ্ব সম্পর্কে তার ধারণা গির্জার মতবাদের পরিপন্থী ছিল। হেমলক পান করিয়ে দার্শনিক সক্রেটিসকে হত্যারপেছনের অন্যতম অভিযোগ ছিল ‘যুবকদের বিপথে চালিত করা এবং শহরের দেবতাদের অস্বীকার করা’। আজও বিশ্বের অনেক দেশেঈশ্বরনিন্দা আইন বিদ্যমান এবং এগুলো প্রায়শই ভিন্নমত, সংখ্যালঘু বা ব্যক্তিগত শত্রুদের দমন করতে ব্যবহৃত হয়।

যখন কোনো ধর্ম রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক ক্ষমতার সাথে একীভূত হয়ে যায়, তখন অন্য ধর্মের অনুসারীরা বা যারা কোনো ধর্মে বিশ্বাসকরে না, তারা প্রায়শই দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয় এবং সংখ্যালঘু ও সংশয়বাদীরা নির্যাতিত হতে শুরু করে। ইতিহাস জুড়ে, ইউরোপের বিভিন্ন খ্রিস্টান রাষ্ট্রে ইহুদিরা নির্যাতিত হয়েছে। হিন্দু শাসকদের অধীনে মুসলমানরা বা মুসলিম শাসকদের অধীনে হিন্দুরাপ্রায়শই নির্যাতিত হয়েছে। নাস্তিক বা সংশয়বাদীদের প্রায়শই ‘নৈতিকভাবে বিচ্যুত’ বা ‘সমাজবিরোধী’ হিসেবে দেখা হয় এবং তাদেরসামাজিক ও আইনি অধিকার খর্ব করা হয় এবং তারা মৌলবাদীদের  হাতে খুন  হয়।

অনেক ধর্ম প্রশ্ন, সন্দেহ এবং সমালোচনামূলক চিন্তার চেয়ে বিশ্বাসের উপর বেশি গুরুত্ব দেয়। তাদের ধর্মগ্রন্থকে অভ্রান্ত এবং পরম সত্যহিসেবে গ্রহণ করতে শেখানো হয়। এই গোঁড়ামি মুক্তচিন্তা, সংশয়বাদ এবং জ্ঞান ও বিজ্ঞানের অগ্রগতির পথে একটি বড় বাধা হতেপারে। যখন কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার বা দার্শনিক তত্ত্ব ধর্মগ্রন্থের আক্ষরিক ব্যাখ্যার সাথে মেলে না, তখন তাকে ‘ধর্মদ্রোহিতা’ বলেআখ্যা দেওয়া হয়। গ্যালিলিওর বিচার এর সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ। ভ্যাটিকানের ‘ইনডেক্স লিব্রোরাম প্রোবিহিটোরুম’ (নিষিদ্ধবইয়ের তালিকা) শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে আসছে। চিন্তার এই দমন শুধুবিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং শিল্পকলা, সাহিত্য এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতের উপরেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

ধর্মনিরপেক্ষতার এই স্রোতের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিশ্বের অনেক অংশে ধর্মীয় মৌলবাদের হিংস্র পুনরুত্থানঘটেছে। এটি আধুনিকতার বিরুদ্ধে এক ধরনের বিদ্রোহের মতো। মৌলবাদীরা আধুনিকতা, বিশ্বায়ন এবং উদারনৈতিক মূল্যবোধকে(যেমন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, লিঙ্গ সমতা, ধর্মনিরপেক্ষতা) তাদের বিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং জীবনধারার জন্য এক গুরুতর হুমকি হিসেবেদেখে। এই হুমকির মুখে, তারা নিজেদের পরিচয় রক্ষার জন্য ধর্মের এক কঠোর, বিশুদ্ধ এবং আপসহীন রূপে ফিরে যেতে চায়। মার্টিনই. মার্টি এবং আর. স্কট অ্যাপলবি সম্পাদিত ‘দ্য ফান্ডামেন্টালিজম প্রজেক্ট’ অনুসারে, মৌলবাদের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো: ধর্মগ্রন্থের আক্ষরিক, অপরিবর্তনীয় এবং অভ্রান্ত ব্যাখ্যার উপর বিশ্বাস; নিজেকে এক পবিত্র সত্যের রক্ষক হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিএবং পারিপার্শ্বিক ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক আক্রমণাত্মক অবস্থান; এবং সমাজ ও রাজনীতিকে সেই কঠোর ধর্মীয়অনুশাসনের অধীনে ফিরিয়ে আনার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বেঞ্জামিন বার্বার তাঁর বিখ্যাত বই ‘জিহাদ বনাম ম্যাকওয়ার্ল্ড’-এ দেখিয়েছেন যে, বিশ্বায়ন যেমন একটি ‘ম্যাকওয়ার্ল্ড’ বাবিশ্বব্যাপী ভোগবাদী, সমগোত্রীয় সংস্কৃতির জন্ম দিচ্ছে, তেমনই এটি ‘জিহাদ’ বা বিভিন্ন উপজাতীয়, ধর্মীয় এবং জাতিগত পরিচয়েরচরমপন্থারও জন্ম দিচ্ছে (বার্বার, ১৯৯৬)। যখন বিশ্বায়ন স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হারানোর ভয় তৈরি করে, তখন মানুষ তাদেরপরিচয়ের জন্য ধর্মের মতো এক চিরন্তন ও পরম আশ্রয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি মৌলবাদ, আমেরিকার ‘বাইবেলবেল্ট’-এ খ্রিস্টান মৌলবাদ, ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, বা ইসরায়েলে চরমপন্থী জায়নবাদ, এ সবই বিশ্বায়ন ও আধুনিকতারপ্রেক্ষাপটে পরিচয় সংকটের বহিঃপ্রকাশ।

যেকোনো বড় কিছু, বিশেষ করে ধর্ম বা দর্শনের মতো জটিল বিষয় বুঝতে হলে, আপনাকে কিছু মানুষের কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়াতে হবে।এই মানুষগুলো আমাদের চারপাশের জগৎ, আমাদের ভেতরের জগৎ এবং এ দুয়ের মধ্যকার রহস্যময় সম্পর্ককে বোঝার জন্যনিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। ধর্ম সম্পর্কে আমাদের আজকের এই উপলব্ধি আকস্মিকভাবে গড়ে ওঠেনি। এটি বহু চিন্তাবিদেরবহু বছরের পরিশ্রম, বিতর্ক এবং অনুসন্ধানের ফল। আমিও সেই চিন্তাবিদদের একজন।

Share the Post: